জাকার্তা, ১ মে ২০২৬ — ইন্দোনেশিয়ার রাজধানীতে আজ এক অসাধারণ কূটনৈতিক সাফল্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা (ASEAN)-এর ১০ সদস্য রাষ্ট্র ‘ডিজিটাল ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ (DEFA) স্বাক্ষর করেছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক ডিজিটাল চুক্তিগুলোর একটি, যা ৬৮০ মিলিয়ন জনসংখ্যার বাজারকে একীভূত করবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আঞ্চলিক জিডিপিতে আনুমানিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উপস্থিতিতে এই চুক্তি ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়।
চুক্তির মূল স্তম্ভসমূহের মধ্যে রয়েছে ক্রস-বর্ডার ডেটা ফ্রি ফ্লো (সীমিত কিছু সংবেদনশীল খাত বাদে), ই-কমার্সে শুল্ক স্থগিতকরণ, ডিজিটাল আইডি সিস্টেমের আন্তঃঅপারেবিলিটি এবং প্রতিযোগিতামূলক ডিজিটাল বাজার নিশ্চিতকরণ। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া ও ব্রুনাই – সব দেশের নেতাই একমত হয়েছেন যে ডিজিটাল রূপান্তরকে এশীয় শতাব্দীর ইঞ্জিন বানাতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক প্রযুক্তি (FinTech) ও ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের ক্ষেত্রে এটি বিপ্লব ঘটাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ডেটা সার্বভৌমত্ব বনাম ‘ফ্রি ফ্লো’: ভারসাম্যের নজির
চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ‘ডেটা উইথ রেসপন্সিবিলিটি’ নীতি — যেখানে সদস্য দেশগুলোর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মান মেনে চলা বাধ্যতামূলক, তবে বাণিজ্যিক ডেটার অবাধ চলাচলে বাধা দেওয়া যাবে না। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছুটা ‘স্থানীয়করণের ছাড়’ রাখা হয়েছে। কিন্তু সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উদ্যোগে প্রাথমিক নথি তৈরি হয়েছে যা বাস্তবে G7 ও OECD দেশগুলোর ডেটা গভর্নেন্সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ এটি এশিয়া-প্যাসিফিক বাণিজ্য স্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে এই চুক্তিকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মুক্ত ও উন্মুক্ত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের বিজয়’ বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেইজিং ‘ডিজিটাল সিল্ক রোড’ উদ্যোগের সাথে ASEAN চুক্তির সমন্বয় করতে আগ্রহী। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হতে চাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে ব্যাপক গতি আসবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্টের সাথে সমন্বয়ের সম্ভাবনা যাচাই করছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই চুক্তি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্যও শিক্ষণীয় – বিশেষ করে BIMSTEC ও সাসেক প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তির পথ খুলে দিতে পারে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ASEAN DEFA ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল একক বাজারের পরে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়ন পথরেখা
যদিও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংসদীয় অনুমোদন ও ২-৩ বছর মেয়াদী ফেজড ইমপ্লিমেন্টেশন বাকি। ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার জন্য উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা প্রাইভেসি আইনের সমন্বয় বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সীমান্তহীন ই-কমার্সের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে একটি ‘একক ডিজিটাল পাসপোর্ট’ চালুর পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক এটিকে ‘মাল্টিল্যাটারালিজমের জন্য নতুন রোডম্যাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আইটি শিল্পের দৈত্যদের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক — মাইক্রোসফট ও গুগল ঘোষণা করেছে যে তারা ASEAN অঞ্চলে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ করবে। এটি বিশ্বায়নের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে ডিজিটাল সংযোগই প্রধান চালিকা শক্তি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ডিজিটাল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। সময়ই বলে দেবে কীভাবে এই উদ্যোগ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করে।
আসিয়ানের সদস্যরা আরও সম্মত হয়েছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ ডিজিটাল লেনদেন আঞ্চলিক মানদণ্ডে পরিচালিত হবে। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে ৫জি নেটওয়ার্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই চুক্তি শুধু অর্থনীতিই নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায়ও বড় ভূমিকা রাখবে — কারণ ডিজিটাল সংযোগ সংঘাত কমাতে পারে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্যও এশিয়ান বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সময়টা ডিজিটাল কূটনীতির স্বর্ণযুগ।
