ব্রাসেলস, ১ মে, ২০২৬ – ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের নেতারা আজ এক যুগান্তকারী বৈঠকে ‘ইউরোপীয় ডিফেন্স ইউনিয়ন’ (EDU) চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যা যুদ্ধোত্তর ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে সম্পূর্ণ রূপ দিতে পারে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কস্তার উপস্থিতিতে একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে এই ঐকমত্য অর্জিত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ইউরোপীয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দিকে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। নতুন এই চুক্তির অধীনে থাকছে একটি যৌথ সামরিক কমান্ড স্ট্রাকচার, দ্রুত স্থাপনযোগ্য ১০ হাজার সদস্যের ‘ইইউ রেসপন্স ফোর্স’, এবং সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় সমন্বয়ের বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মানদণ্ড।

জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এক যৌথ বিবৃতিতে একে “ইউরোপের জন্য সিকিউরিটি গ্যারান্টির নতুন দিন” বলে আখ্যা দিয়েছেন। হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড প্রাথমিক দ্বিধার পর চুক্তির পক্ষে ভোট দেয়, তবে কিছু শর্তে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় থাকবে। চুক্তিটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ প্রভাব এবং ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের সম্ভাব্য ওঠানামার প্রেক্ষিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ডিফেন্স ইউনিয়নের মাধ্যমে ইইউ প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা বাজেট তৈরির রূপরেখা দেয়, যার প্রাথমিক তহবিল ধরা হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ইউরো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া

হোয়াইট হাউসের এক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই উদ্যোগকে "ইউরোপীয় দায়িত্বভারের ন্যায্য ভাগাভাগি" হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে ন্যাটোর সামগ্রিক কমান্ড কাঠামোর সাথে এটিকে সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। ন্যাটোর মহাসচিব জানিয়েছেন, ইউরোপের ক্ষমতা বৃদ্ধি জোটকে শক্তিশালী করবে, যদি তা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার পরিপূরক হয়। তবে রাশিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ‘নতুন সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের প্রতিক্রিয়ায় ক্রেমলিন জানিয়েছে, তারা ‘কাউন্টারমেজার’ বিবেচনা করছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও কূটনৈতিক তাৎপর্য

১৯৫০-এর দশকে ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায় থেকে শুরু করে আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন—প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রটি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল ‘সবচেয়ে সংবেদনশীল’ দিক। ২০১৭ সালে পিএসসিও (PESCO) চালু হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে একীভূতকরণের অগ্রযাত্রা শুরু করে। কিন্তু রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তাই ইউরোপীয় নেতাদের দ্রুত এগিয়ে নিয়ে আসে। EU ডিফেন্স এজেন্সির নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষে ২৭টি দেশের মধ্যে ২০টিই জিডিপির ২% প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাবে। এই চুক্তির ফলে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়নে আরও যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত হবে, যাতে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি যেমন ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা, এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স-চালিত সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে ইউরোপ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়।

“আজকের স্বাক্ষর শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি ইউরোপীয় জনগণের আত্মরক্ষার অধিকার ও সংহতির সর্বশ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। আমরা একটি ভাগাভাগি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।” — রবার্টা মেৎসোলা, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে একটি বহুমুখী স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, স্বল্প সময়ে ২৭টি দেশের সামরিক মতবাদ, অস্ত্র প্ল্যাটফর্ম একীভূতকরণ চ্যালেঞ্জিং। তবুও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও মার্কিন নির্বাচনী মৌসুমের প্রভাব ইউরোপকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। ব্রাসেলসের থিঙ্ক ট্যাংকের মতে, এটি ইউরোপের জন্য ‘স্পুটনিক মুহূর্ত’—একটি সতর্কবার্তা ও একই সাথে ঐক্যের জাগরণী।

অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব

ইউরোপীয় ডিফেন্স ফান্ড এখন থেকে দ্বিগুণ করার কথা ভাবা হচ্ছে, যা প্রতিরক্ষা শিল্পে ১ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং নতুন প্রজন্মের সাঁজোয়া যান, সেনা সরঞ্জামের ব্যাপক চুক্তি আসন্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী ৫ বছরে যৌথ প্রকল্পে ২০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি ঘুরবে। ফ্রান্স ও জার্মানি যৌথভাবে একটি ‘ইউরোপীয় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ আনবে, সেই সাথে পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে প্রস্তুত রাখা হবে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী। ইতালি, স্পেন এবং নেদারল্যান্ডস নৌ-প্রকল্পে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, কূটনৈতিকভাবে ইইউ এখন ‘পাওয়ার প্রক্টর’ থেকে ‘হার্ড পাওয়ারে’ উত্তরণ ঘটাচ্ছে।

একইসঙ্গে, যুক্তরাজ্য—যা বর্তমানে ইইউ বহির্ভূত, তবে নিরাপত্তা অংশীদারি চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত, এই চুক্তিতে পর্যবেক্ষক মর্যাদা চেয়েছে। কানাডা ও নরওয়েও কৌশলগত সমন্বয়ের আগ্রহ দেখিয়েছে। এই চুক্তি আসন্ন জি৭ ও জি২০ বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয় হবে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও একটি বার্তা হচ্ছে—বহুমুখী মেরুকরণের এই যুগে আঞ্চলিক জোট ও প্রতিরক্ষা কৌশল পুনঃসংজ্ঞায়িত হচ্ছে।

সামনের মাসগুলোতে চুক্তির বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আইনী জটিলতা এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। তবে আজকের স্বাক্ষরই দেখিয়ে দেয় ইউরোপীয় রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে যাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. হানা ভের্বেক বলেছেন, “ইউরোপ এখন আত্মনির্ভরশীল প্রতিরক্ষার পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করল।” আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একে দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভবিষ্যতে দ্রুত সংকট মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা অভিযান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সামরিক সহায়তা দিতে সক্ষম হবে। এটি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভিন্নমত কমিয়ে অভিন্ন কৌশল প্রতিষ্ঠা করবে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে ইইউর নিজস্ব সামরিক সদর দপ্তর (একটি পূর্ণাঙ্গ এমএইচকিউ) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ব এখন নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে না গিয়ে একটা ‘প্রতিরক্ষা পুনর্বিন্যাসের যুগে’ প্রবেশ করছে এবং ইউরোপ সেই নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।