ঐতিহাসিক আমাজন সংরক্ষণ চুক্তি: ৮ দেশের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত | জলবায়ু সাফল্য

ঐতিহাসিক আমাজন সংরক্ষণ চুক্তি: ৮ দেশের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত | জলবায়ু সাফল্য


 

ঐতিহাসিক আমাজন সংরক্ষণ চুক্তি: বিশ্বের ‘ফুসফুস’ বাঁচাতে ৮ দেশের বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো

বেলেম, ব্রাজিল, ১ মে ২০২৬ — আমাজন সহযোগিতা চুক্তি সংস্থার (ACTO) আটটি সদস্য দেশ আজ এক যুগান্তকারী শীর্ষ সম্মেলনে ‘বেলেম ডিক্লারেশন ২০২৬’ স্বাক্ষর করেছে। ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা, গায়ানা ও সুরিনামের নেতারা এই ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাজন রেইনফরেস্টের বন উজাড়ের হার ৮০% কমাতে হবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নিট শূন্য বন উজাড় অর্জন করতে হবে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্ট সংরক্ষণের জন্য এ পর্যন্ত গৃহীত সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি কাঠামো।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, “আমাজন পৃথিবীর নিয়ামক। এটি ধ্বংস হলে আমরা সকলেই ধ্বংস হব। আজ আমরা ইতিহাসের ভুল সংশোধন করছি এবং একটি নতুন সবুজ অধ্যায় শুরু করছি।” চুক্তিটি বন উজাড়ের বিরুদ্ধে কঠোর কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করে, যার মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট নজরদারি ব্যবস্থার যৌথ ব্যবহার, বেআইনি খনিজ উত্তোলন ও কাঠ পাচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আইন প্রয়োগ, এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমির স্বীকৃতি ও সুরক্ষা।

২০ বিলিয়ন ডলারের সবুজ তহবিল ও বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি

চুক্তির অংশ হিসেবে উন্নত দেশগুলো (নরওয়ে, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) আগামী পাঁচ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের সবুজ তহবিল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই অর্থ টেকসই অর্থনৈতিক প্রকল্প, পুনর্বনায়ন এবং আদিবাসী অঞ্চলে পুলিশিং কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা করেছে যে আমাজন পণ্য বর্জনের বাণিজ্য বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে তারা সহায়তা করবে, যদি বন উজাড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। এদিকে, জাতিসংঘ মহাসচিব এক বিবৃতিতে এই চুক্তিকে ‘পৃথিবীর জন্য অক্সিজেন রেসকিউ প্ল্যান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

🌎 ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কাউন্সিলের প্রতিবেদন: আমাজন এখন ‘টিপিং পয়েন্টের’ কাছাকাছি। এই চুক্তি সময়মতো গৃহীত হলে ২ বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ রোধ করা সম্ভব হবে।

আদিবাসী নেতাদের ভূমিকা ও ঐকমত্য

চুক্তি প্রণয়নে আদিবাসী সংগঠনগুলোর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। ইউনিয়ন অফ ইন্ডিজেনাস পিপলস অব আমাজন (COICA) এর নেতা নিহুয়ে ঝুনকুই বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলছি যে আমাজন রক্ষা মানে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা। আজ রাষ্ট্রগুলো অবশেষে আমাদের কথা শুনল।” চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় আদিবাসী অঞ্চলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ‘ফ্রি, প্রায়র অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ১৫টি আদিবাসী সংরক্ষিত অঞ্চলের সীমানা চূড়ান্তকরণে একমত হয়েছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো।

বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ

যদিও চুক্তি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে, কিছু সমালোচক বলছেন যে ভেনেজুয়েলা ও সুরিনামের মতো দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া কৃষি ও খনি খাতের লবি গোষ্ঠী ইতোমধ্যেই কঠোর বিধিনিষেধের বিরোধিতার আভাস দিয়েছে। তবে ব্রাজিলের পরিবেশমন্ত্রী মেরিনা সিলভা স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ও নিয়মিত অডিট থাকবে। কোন দেশ লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক সহায়তা স্থগিত করা হবে।” বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের চেয়ে বৈশ্বিক পরিবেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার নজির।

জলবায়ু সম্মেলন COP30-এর জন্য রোডম্যাপ

আগামী বছর ব্রাজিলের বেলেমেই অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP30। এই চুক্তিকে সেই সম্মেলনের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আশা করা যায়, আমাজন মডেল অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন যেমন কঙ্গো বেসিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন সংরক্ষণে উদাহরণ হয়ে উঠবে। চীনের জলবায়ু দূত ও ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে এবং তাদের নিজস্ব বন সংরক্ষণ নীতি পর্যালোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমাজনের অর্থনৈতিক মূল্য (কার্বন সিঙ্ক, পানি চক্র, জৈব বৈচিত্র্য) প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার। এই চুক্তি না হলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে প্রায় ৪০% আমাজন সাভানায় রূপ নিত। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্যও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ—কারণ আমাজনের ধ্বংস বৈশ্বিক উষ্ণতা ও চরম আবহাওয়া বাড়াবে, যা দুর্বল দেশগুলোর জন্য হুমকি। তাই আজকের সিদ্ধান্ত শুধু লাতিন আমেরিকার নয়, গোটা মানবজাতির জয়।

পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে সদস্য দেশগুলো জাতীয় কর্মপরিকল্পনা জমা দেবে। স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘আমাজন ওয়াচ’ চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ট্র্যাক করবে। সম্মেলন শেষে লুলা দা সিলভা বলেন, “আমরা পরীক্ষার মুখে আছি, কিন্তু একসঙ্গে কাজ করলে পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে পারব।” আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একে ২০২৬ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অগ্রগতি বলে উল্লেখ করছে।

🌱 পরবর্তী সংবাদ (CTA): আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাজন দেশগুলোতে বন উজাড় রোধে স্থানীয় বাস্তবায়ন কৌশল ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশেষ ফিচার প্রকাশ হবে। সাথে থাকুন ও টিউন করুন।
© ২০২৬ গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ওয়াচ | টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সচেতন প্রতিবেদন
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url