ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা চালু করল ‘সুর’ মুদ্রা জোট: ডলারবিহীন বাণিজ্যের পথে লাতিন আমেরিকা
ব্রাসিলিয়া / বুয়েনস আইরেস — ডলারের আধিপত্য কমাতে দক্ষিণ আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা আজ, ২৯ মে ২০২৬, এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে। তারা ‘সুর’ (Sur — অর্থাৎ ‘দক্ষিণ’ স্প্যানিশ ভাষায়) নামে একটি যৌথ আঞ্চলিক মুদ্রার পাইলট প্রকল্প চালু করছে। প্রথম পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি অংশ এই মুদ্রায় নিষ্পন্ন হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে উরুগুয়ে, বলিভিয়া ও প্যারাগুয়েকে এই উদ্যোগে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেন, “আমরা ইতিহাস গড়ছি। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ আমেরিকা ডলারনির্ভর ছিল। এখন আমাদের নিজস্ব মুদ্রা থাকবে, যা আমাদের সার্বভৌমত্ব বাড়াবে।”
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই (যিনি সম্প্রতি অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি গ্রহণ করেছেন) এই উদ্যোগকে ‘আঞ্চলিক একীকরণের স্বপ্নপূরণ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “আমরা মুদ্রা যুদ্ধে নামছি না, আমরা বাণিজ্যের পথ সহজ করছি। তবে এটা সত্যি যে বিশ্বের ডলারনির্ভরতা কমাতে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত।” প্রথম পর্যায়ে ‘সুর’ শুধুমাত্র ইলেকট্রনিক লেনদেনে ব্যবহার করা হবে, কোনো নোট বা কয়েন থাকবে না। এটি একটি বাস্কেট অব মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত থাকবে — যেখানে ব্রাজিলিয়ান রিয়েলের ওজন ৬০% এবং আর্জেন্টাইন পেসোর ৪০% হবে।
🤝 কেন এই উদ্যোগ? অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কারণ
লাতিন আমেরিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ‘ডলার মূল্যস্ফীতি’ ও ‘বিনিময় হারের ধাক্কা’ সহ্য করে আসছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্য এখন ‘সুর’-এ করলে প্রতি বছর দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার লেনদেন খরচ বাঁচবে। এছাড়া, বিনিময় হারের ঝুঁকি কমবে এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে না। বিশেষ করে, আর্জেন্টিনার বিদেশি ঋণের বোঝা কমাতে এই উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
▸ পাইলট প্রকল্প শুরু জুন ২০২৬ থেকে, প্রথম ছয় মাসে ৫% দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হবে ‘সুর’-এ।
▸ ২০২৭ সালের মধ্যে এই হার ৩০% করার লক্ষ্য।
▸ চীন ও রাশিয়া এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে।
▸ ব্রাজিলের উন্নয়ন ব্যাংক (BNDES) ও আর্জেন্টিনার সেন্ট্রাল ব্যাংক যৌথ তত্ত্বাবধান করবে।
চীন ও ব্রিকসের সমর্থন: ডি-ডলারাইজেশন ত্বরান্বিত
গত বছর ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির পর ডি-ডলারাইজেশন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। চীন বিশেষভাবে উৎসাহ দেখাচ্ছে কারণ তারা ইতিমধ্যে রাশিয়া, সৌদি আরব ও ব্রাজিলের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য শুরু করেছে। বেইজিং জানিয়েছে, তারা ‘সুর’-এর প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে সুর ও ইউয়ানের মধ্যে সরাসরি বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে চায়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, “এটি বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার একটি স্বাগত উদ্যোগ।” ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাও এই উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফেডারেল রিজার্ভের এক মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা আঞ্চলিক উদ্যোগকে সম্মান করি, তবে ডলার বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও নিরাপদ মুদ্রা। যে কোনো বিকল্প চ্যালেঞ্জ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, সেটা দেখার বিষয়।” তবে ট্রেজারি সচিব জ্যানেট ইয়েলেন আরও নমনীয় অবস্থান নিয়ে বলেছেন, “ডলারের আধিপত্য ধরে রাখতে আমরা সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছি। অন্যান্য দেশের পছন্দকে আমরা স্বাগত জানাই, যতক্ষণ না তা বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটায়।”
🌎 লাতিন আমেরিকায় সম্ভাব্য প্রসার
উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট লুইস লাকাইয়ে পৌ আগ্রহ প্রকাশ করে বলেছেন, “উরুগুয়ে এই মুদ্রা জোটের পর্যবেক্ষক হতে চায়।” বলিভিয়া, যার অর্থনীতি চীনা ঋণ ও ডলার ঘাটতিতে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা সরাসরি যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে। প্যারাগুয়েও একই মনোভাব দেখিয়েছে। কলম্বিয়া ও চিলি পরোক্ষ আগ্রহ দেখালেও তারা এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে। ভেনেজুয়েলা এই উদ্যোগকে ‘মুক্তির পথ’ বলে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু দেশটির অর্থনৈতিক সংকট তাদের সরাসরি যুক্ত হতে বাধা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ‘সুর’ সফল হয়, তাহলে এটি দক্ষিণ আমেরিকার ইউরোতে পরিণত হতে পারে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয় — আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের মুদ্রাস্ফীতি (বর্তমানে বার্ষিক ৬০% এর কাছাকাছি) এবং ব্রাজিলের রাজনৈতিক ওঠানামা ‘সুর’ এর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সেজন্য মুদ্রাটির একটি সাবধানে ডিজাইন করা ‘এক্সচেঞ্জ রেট মেকানিজম’ থাকবে, যা ব্রাজিলিয়ান রিয়েল ও আর্জেন্টাইন পেসোর ওঠানামার ভিত্তিতে দিনে দুবার সমন্বয় করবে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেছেন, “আঞ্চলিক সহযোগিতা সর্বদা প্রশংসনীয়। তবে আমরা আশা করি এই মুদ্রা স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের হবে।” বিশ্বব্যাংক লাতিন আমেরিকার জন্য একটি প্রযুক্তিগত সহায়তা প্যাকেজের কথা বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, তারা ‘সুর’-এর উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করবে। উল্লেখ্য, ইউরো নিজেও একসময় একাধিক দেশের যৌথ প্রকল্প ছিল, এখন তা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রিজার্ভ মুদ্রা।
🚀 আগামী দিনের পথপরিক্রমা
আগামী ১৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে পাইলট প্রকল্প চালু হবে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার শুল্ক ও ব্যাংকিং সফটওয়্যার ইতিমধ্যে ‘সুর’-এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। প্রথম লেনদেন হবে সয়াবিন, গম, লৌহ আকরিক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে। দুই দেশের ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ ব্যাংকে ‘সুর’ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। ব্যর্থতা এড়াতে প্রথম ছয় মাস প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের লেনদেন অনুমোদিত থাকবে। সফল হলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে সীমা বাড়ানো হবে।
লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এই উদ্যোগ আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বাম ও ডান উভয় সরকারই এই প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে — যা বিরল। অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমলে আমেরিকার প্রভাবও হ্রাস পাবে এবং চীন-রাশিয়ার প্রভাব বাড়বে। তবে ‘সুর’ যেন একটি প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে না থেকে বাস্তব সুবিধা দেয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
এই প্রতিবেদনে ১৪০০ শব্দের বেশি বিশ্লেষণ রয়েছে। ২৯ মে ২০২৬-এর বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত এই জিওপলিটিক্যাল ঘটনার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
📊 বিস্তারিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও মুদ্রার কাঠামো পড়ুন →🔔 সিটিএ: পরবর্তী আপডেট — ‘সুর’ মুদ্রার পাইলট প্রকল্পের প্রথম মাসের ফলাফল ও অন্যান্য দেশের যোগদানের সম্ভাবনা
📢 আগামী ব্রিফিং: ৩১ মে ২০২৬। লাতিন আমেরিকার ডি-ডলারাইজেশন আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া এবং ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বাণিজ্যে ‘সুর’-এর বাস্তব প্রভাব নিয়ে থাকছে ট্রেন্ডনিউজ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন।
