ম্যানিলা / হ্যানয়ি / কুয়ালালামপুর — দক্ষিণ চিন সাগরের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই আজ, ২৯ মে ২০২৬, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া এক যুগান্তকারী ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ‘ম্যানিলা ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক’ নামে পরিচিত এই চুক্তিতে তিন দেশ যৌথ নৌ টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আক্রমণের মুখে পারস্পরিক পরামর্শ সাপেক্ষে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও এটি পূর্ণ সামরিক জোট নয়, বিশ্লেষকরা একে ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন’ বলে অভিহিত করেছেন। চীন অবিলম্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “এই চুক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং এটি চীনের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের পরিপন্থী।”

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, আমরা আমাদের নিজস্ব অধিকার ও সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি। দক্ষিণ চিন সাগর সবার জন্য মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ থাকা উচিত।” ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে ইউএনসিএলওএস (UNCLOS)-এর ভিত্তিতে এই সহযোগিতা গড়ে উঠবে।” মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান জানান, চুক্তিটি আক্রমণাত্মক নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক।

📜 চুক্তির মূল বিষয়বস্তু: কী আছে, কী নেই?

ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মূল পাঁচটি স্তম্ভ হলো — (১) দক্ষিণ চিন সাগরের নির্দিষ্ট চারটি এলাকায় যৌথ টহল ও মহড়া; (২) উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য বিনিময়; (৩) সামুদ্রিক দুর্ঘটনা ও জরুরি উদ্ধার অভিযানে পারস্পরিক সহায়তা; (৪) চীন কর্তৃক দখলকৃত বাস্তব-ভিত্তিক বৈশিষ্ট্যসমূহের (ফিচার) ওপর নজরদারি ডেটা শেয়ার; এবং (৫) তৃতীয় পক্ষের হামলা মোকাবিলায় বৈঠকের ব্যবস্থা। তবে এতে ‘আক্রমণ হলে যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া’-র কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ‘কৌশলগত সমন্বয়’ জোট, পূর্ণ সামরিক জোট নয় — যাতে চীনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করে কার্যকর অবস্থান নেওয়া যায়।

🚢 ম্যানিলা ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মূল দিক:
▸ প্রথম যৌথ টহল আগস্ট ২০২৬-এ স্কারবোরো শোল (ফিলিপাইন) ও স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের কাছে অনুষ্ঠিত হবে।
▸ একটি যৌথ সামুদ্রিক কমান্ড সেল স্থাপন, যা বার্ষিক পর্যায়ে সক্রিয় থাকবে।
▸ চীন নির্মিত কৃত্রিম দ্বীপ ও সামরিক স্থাপনার ২৪/৭ নজরদারি ব্যবস্থা।
▸ তিন দেশের মধ্যে অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিনিময় — বিশেষ করে ড্রোন ও কোস্টাল রাডার সিস্টেম।

চীনের কঠোর প্রতিক্রিয়া: ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’

বেইজিং থেকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন এক বিবৃতিতে বলেন, “দক্ষিণ চিন সাগরের বিরোধ সমাধানের জন্য একমাত্র পথ হলো সরাসরি আলোচনা। তৃতীয় পক্ষের সামরিক জোট এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াবে। চীন তার সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।” চীনের সামরিক বাহিনী (পিএলএ) দক্ষিণ চিন সাগরে সতর্কতামূলক ড্রিল ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির জবাবে চীন সম্ভবত স্কারবোরো শোল ও মিসচিফ রিফের কাছাকাছি আরও সামরিক স্থাপনা শক্তিশালী করবে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র বলেন, “আমরা আঞ্চলিক মিত্রদের স্ব-সুরক্ষার অধিকার সমর্থন করি। এই চুক্তি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মুক্ত ও উন্মুক্ত আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।” জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও সমর্থন জানিয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়া, যা আসিয়ানের নেতৃত্বে রয়েছে, তারা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেছে, “আমরা আশা করি এই চুক্তি আসিয়ানের ঐক্যের ক্ষতি করবে না এবং সকল পক্ষ সংলাপ চালিয়ে যাবে।”

🌊 ভূরাজনৈতিক প্রভাব: মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতার নতুন মোড়

দক্ষিণ চিন সাগর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথগুলোর একটি — এখান দিয়ে বার্ষিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের জাহাজ চলাচল করে। চীন ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’-এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশের ওপর দাবি রাখে, যা ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও তাইওয়ানের দাবির সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ। ২০১৬ সালের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল চীনের দাবি বাতিল করলেও বেইজিং সেই রায় মানে না। গত তিন বছরে চীন মিসাইল ব্যাটারি ও এয়ারস্ট্রিপসহ আরও পাঁচটি কৃত্রিম দ্বীপ সম্প্রসারণ করেছে, যা আঞ্চলিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

ত্রিপাক্ষিক চুক্তি কার্যকরভাবে আসিয়ানের নিরাপত্তা কাঠামোকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারে। আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ চিন সাগর ইস্যুতে সম্মিলিত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই চুক্তি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, কিছু সদস্য দেশ ঐকমত্য ছাড়াই দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। এটি চীনের জন্য একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, কারণ বেইজিং চায় আসিয়ানকে একক ব্লক হিসেবে নিজের দিকে টেনে রাখতে।

অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা দিক

চুক্তির আওতায় তিন দেশ প্রতিরক্ষা বাজেটে সমন্বয় ও যৌথ প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করছে। ফিলিপাইন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্রহ্মোস মিসাইল ও ড্রোন কিনছে, ভিয়েতনাম রাশিয়া ও ইসরায়েলের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করছে, আর মালয়েশিয়া ইউরোপীয় উৎস থেকে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। কিন্তু ত্রিপাক্ষিক চুক্তি ‘সুদূর প্রাচ্যের ন্যাটো’-তে পরিণত হবে না, কারণ তিন দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। তথাপি, এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আগামী আগস্ট মাসে প্রথম যৌথ টহলের সময় চীন কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেদিকে তাকিয়ে বিশ্ব। এই টহল চীনের মিলিশিয়া জাহাজ ও কোস্ট গার্ডের মুখোমুখি হতে পারে, যা সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে কূটনীতিকরা আশা করছেন, সব পক্ষ সংযম দেখাবে। ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এনরিকে মানালো বলেন, “আমরা সংঘাত চাই না, আমরা আইনের শাসন চাই। এই চুক্তি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার জন্য।”

🚢 আগামী দিনের পথপরিক্রমা

চুক্তিটি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তিন দেশের পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এর পক্ষে থাকায় অনুমোদন প্রায় নিশ্চিত। তারপর আগস্টে প্রথম যৌথ টহল শুরু হবে। সমান্তরালে, আসিয়ান ও চীনের মধ্যে ‘কোড অফ কন্ডাক্ট’ (COC) আলোচনা অব্যাহত থাকবে — তবে এই চুক্তির কারণে চীন আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ চিন সাগর এখন ইন্দো-প্যাসিফিকের সবচেয়ে উত্তপ্ত জ্বালানী সংগ্রহস্থলে পরিণত হয়েছে।

এই প্রতিবেদনে ১৩৫০ শব্দের বেশি বিশ্লেষণ রয়েছে। ২৯ মে ২০২৬-এর বৈশ্বিক নিরাপত্তা রাজনীতির শীর্ষ এই ঘটনার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

🗺️ পূর্ণ বিশ্লেষণ ও কৌশলগত প্রভাব পড়ুন →