প্যারিস ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ১৩ মে, ২০২৬ — ফ্রান্সের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মোড়। দীর্ঘ এক মাসের আলোচনা ও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পরামর্শের পর অবশেষে বামপন্থী জোট ‘নিউ পপুলার ফ্রন্ট’ (নুভো ফ্রঁ পপুলের) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আজ সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, জঁ-লুক মেলঁশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন এবং আগামীকাল ১৪ মে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে।
— জঁ-লুক মেলঁশন, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় পরিষদ এর বাইরে ভাষণে
নির্বাচন ও জোট গঠনের পটভূমি
গত ৫ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ম্যাক্রোঁর সেন্ট্রিস্ট জোট তৃতীয় স্থানে নেমে আসে। র্য�ি ন্যাসিওনাল (লে পেনের দল) প্রথম স্থান পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৮৯ আসন থেকে অনেক দূরে ছিল। বামপন্থী ‘নিউ পপুলার ফ্রন্ট’ অপ্রত্যাশিতভাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু কোনো একক পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠ না পাওয়ায় টেকনোক্র্যাট সরকারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে গতকাল রাতে মেলঁশন, সবুজ নেত্রী মরিন তোন্দলিয়ে এবং সমাজতন্ত্রী নেতা ওলিভিয়ে ফোর এক যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী, ৩০টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ১৪টি লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (মেলঁশনের দল), ৮টি গ্রিন পার্টি, ৭টি সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং বাকিগুলো ছোট বাম ও কমিউনিস্ট দল পাবে।
ইউরোপীয় ইতিহাসে এত বড় বামপন্থী জোট সরকারের নজির বিরল। মেলঁশন প্রথম দিনেই ঘোষণা দিয়েছেন, পেনশন সংস্কার আইন বাতিল, পাবলিক মৌলিক পরিষেবায় বিনিয়োগ এবং সম্পদ কর পুনঃপ্রবর্তন হবে। তিনি ন্যাটোর প্রতি নীতিও পর্যালোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন, যা ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক এজেন্ডা এবং ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া
নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে ২০২৬ সালের বাজেট সংশোধন। প্রস্তাবিত কর্পোরেট কর ২৫% বৃদ্ধি, বার্ষিক আয় ৪ লাখ ইউরোর উপরে ৯০% কর ধার্য ও ফুয়েল ট্যাক্স কমানোর পরিকল্পনা আছে। প্যারিসের CAC 40 সূচক ২.১% কমেছে, কিন্তু বন্ড মার্কেট এখনো স্থিতিশীল। ফ্রাঙ্কফুর্ট ও বার্লিনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে একটি বামপন্থী ফ্রান্স ইউরোপীয় ফিসকাল রুলস নিয়ে টানাপড়েন তৈরি করতে পারে। জার্মান চ্যান্সেলর বলেছেন, “যুক্ত ইউরোপের স্বার্থে আমরা ফ্রান্সের সংলাপের জন্য প্রস্তুত।”
মেলঁশন অবশ্য বলেন, “আমরা ইউরোপ ছাড়ছি না, বরং সামাজিক ইউরোপের দাবি জানাই। আর্থিক চুক্তি পুনর্লিখন করতে হবে।” ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আপাতত নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, আর স্পেনের বাম সরকার অভিনন্দন জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাত্রা: ইউক্রেন, ন্যাটো ও বৈশ্বিক প্রভাব
মেলঁশন দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং শান্তি আলোচনার পক্ষপাতী। নতুন সরকার কিয়েভে মিরাজ ২০০০ সরবরাহ স্থগিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো। তবে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতিতে কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখবেন। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ফ্রান্সের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মূলত প্রেসিডেন্টের হাতে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেন ইস্যুতে সরাসরি সমাবর্তন ডাকতে পারেন। এই দ্বৈততা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘কোহ্যাবিটেশন’-এর নতুন এবং সম্ভাব্য তিক্ত একটি পর্ব শুরু হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, তারা ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে সম্মান করে, তবে ন্যাটো থেকে ফ্রান্সের সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা না করার আশা প্রকাশ করে। চীন এই জোটকে ‘স্বাগত’ জানিয়েছে এবং বলেছে, বহুমুখী বিশ্বের জন্য এটি ভালো।
ঘরোয়া চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ফ্রান্সের অভ্যন্তরে ডানপন্থী ও প্রগতিশীলদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি আরও প্রকট হতে পারে। আন্দোলনকারী কৃষক ও মধ্যবিত্ত কর বোঝা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে জরিপ বলছে, ফরাসিদের ৫৯% এই জোট সরকারকে সমর্থন করছেন—কারণ তারা জাতীয় পুনর্গঠন চান। পেনশন সংস্কার বাতিলের প্রতিশ্রুতি ও ন্যূনতম মজুরি মাসে ১,৬০০ ইউরো করার পরিকল্পনা জনপ্রিয়। বাম জোটও টিকে থাকবে কি না, সেটি নির্ভর করবে প্রথম বছরের ফলাফলের ওপর। ইতিহাসে ফ্রান্সের বাম জোটগুলো প্রায়ই দলগত দ্বন্দ্বে ভেঙে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই ঘটনা ইতিমধ্যে ট্রেন্ডিং শিরোনামে পরিণত হয়েছে। ইউরোপের ‘দ্বিতীয় উপনিবেশমুক্তি’ থেকে শুরু করে অভিবাসন নীতি—সবকিছুতেই সংস্কার আসবে বলে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অংশীদার। নতুন ফরাসি সরকার যদি সত্যি সত্যি বহুপাক্ষিকতায় ফিরে আসে, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। আগামী কয়েক মাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থিতিশীলতার জন্য নির্ধারক হবে।
এক কথায়, মেলঁশনের নেতৃত্বাধীন নিউ পপুলার ফ্রন্ট ইউরোপের বাম রাজনীতির জন্য এক নতুন দুরন্ত অধ্যায় রচনা করছে। সাফল্য না ব্যর্থতা — সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে আপাতত প্যারিসের বুর্জে একটি নতুন রাজনৈতিক বাতাস বইছে।
