সিউল ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ৯ মে, ২০২৬ — দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও প্রেসিডেন্ট অভিশংসনের পর অবশেষে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নতুন নেতা পেয়েছে। আজ অনুষ্ঠিত জরুরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রক্ষণশীল ‘ইউনাইটেড ফিউচার পার্টি’ জোট বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, প্রার্থী পার্ক জি-হুন প্রায় ৫৪% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী উদারপন্থি প্রার্থী পেয়েছেন ৪৩% ভোট। প্রায় ৭৮% ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড ভোটার সাড়া জাগিয়েছে।

নতুন প্রেসিডেন্ট সন্ধ্যায় দেয়া বিজয় বক্তৃতায় বলেছেন, “আমি উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের কাছে সংলাপের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনার অবসান ও যৌথ অর্থনৈতিক সহযোগিতা আমাদের লক্ষ্য। কিম জং উনের সাথে শীর্ষ সম্মেলনের ব্যাপারে আমরা প্রস্তুত।” ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইওলের কঠোর নীতি কোরীয় সম্পর্ককে চরম টানাপোড়েনে ফেলেছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় খাদ্য সহায়তা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইঙ্গিত নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পরিষদ ইতিমধ্যে উত্তর-দক্ষিণ যোগাযোগ পুনর্বহালের রেজুলেশন পাস করেছে।

“দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে। আজকের নির্বাচন শান্তি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য অনন্য সুযোগ। পুরো বিশ্বের চোখ এখন সিউল ও পিয়ংইয়ং-এর দিকে - আমরা দ্বিধা করব না।”
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পার্ক জি-হুন, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ভবন, সিউল

অভিশংসনের পটভূমি ও জরুরি নির্বাচনের পথ

গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইওল ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিশংসিত হন, যা দেশটিকে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক শূন্যতায় ফেলে দেয়। এর ফলে তিন মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন। সংবিধান অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে জরুরি নির্বাচন বাধ্যতামূলক হলেও কোরীয় উপদ্বীপের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার কারণে তা একটু পিছিয়ে যায়। অবশেষে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তিথি নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক দল ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও অবাধ বলে অভিহিত করেছে।

নির্বাচনী ইশতেহারে পার্ক জি-হুন ‘নতুন সমৃদ্ধির সেতু’ নামে একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন যাতে কেজেবি সংস্কার, উত্তর কোরিয়ার সাথে সহযোগিতামূলক সীমান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চীন-মার্কিন কূটনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অন্তর্ভুক্ত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ দক্ষিণ কোরিয়া আঞ্চলিক মেরুকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে কিম জং উনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, “বক্তৃতার স্বর ইতিবাচক, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।” গত দেড় বছরে দুই কোরিয়ার মধ্যে সব ধরনের সামরিক হটলাইন অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সিউল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পার্ক সুং-মিন বলেন, “আগামী সপ্তাহে যৌথ যোগাযোগ চালু হলে এটি বড় অগ্রগতি হবে।” অপরদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বলেছেন, “কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা দেখে আমরা উৎসাহিত।”

রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নির্বাচনকে ‘গণতান্ত্রিক অর্জন’ বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব কোরীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান সংলাপ শুরু করতে। বিশেষ করে এশিয়ার অন্যান্য দেশ — বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর — দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন নীতির কারণে সম্ভাব্য বাণিজ্য সম্প্রসারণের কথা ভাবছে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ: ১২০০ শব্দের গভীর প্রতিবেদন

নতুন প্রেসিডেন্ট আরো বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার মানবিক সহায়তা ও কোভিড-পরবর্তী যৌথ স্বাস্থ্য উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে চালু হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জ নির্বাচনের ফলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ২.১% বেড়েছে। সিউলের গঙ্গাম জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। অন্যদিকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, পিয়ংইয়ং এর পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে প্রস্তুত কিনা সেটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আঞ্চলিক কূটনৈতিক সফরে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সফরের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

২০২২ সাল থেকে কোরীয় উপদ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘটনা প্রায় শতাধিক, যা এশিয়ার নিরাপত্তা নাজুক করে তুলেছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি মধ্যপন্থী শক্তির উত্থান ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্ক প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক বিনিময় মডেল আনতে পারে যা জার্মানির ‘ওস্টপলিটিক’ নীতির আদলে তৈরি। যাই হোক না কেন, উপদ্বীপে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া রপ্তানি আয়ের অন্যতম অংশীদার, এবং নতুন প্রশাসন যদি উত্তেজনা কমিয়ে বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে রেমিট্যান্স ও গার্মেন্ট শিল্পের ওপর প্রভাব পড়বে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন, শিগগিরই সিউলে কর্মী派遣 বিষয়ে আলোচনা জোরদার হবে। সালোক সোহেল, অধ্যাপক (প্রশান্ত মহাসাগরীয় অধ্যয়ন কেন্দ্র) বলেন, “এটি সম্ভাব্য স্বর্ণযুগের সূচনা হতে পারে যদি পিয়ংইয়ং সাড়া দেয়।”

মাঝরাত পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হবে। ইতিমধ্যে মন্ত্রীপরিষদ গঠনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধান কূটনীতিক লি সো-ইয়ন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা টিম পুনর্গঠন করবেন নতুন প্রেসিডেন্ট। বৈশ্বিক ট্রেন্ডের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, এই ইস্যুতে #KoreaPeace ও #NewHopeSeoul হ্যাশট্যাগ টুইটারে ট্রেন্ডিং অবস্থানে রয়েছে। গ্লোবাল পলিটিক্স টুডে একে ‘সপ্তাহের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছে।

সমাপ্তিতে বলা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাঁধে এখন বিশাল দায়িত্ব। বিশ্ব তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে—একটি অবিস্মরণীয় কূটনৈতিক কামব্যাক তৈরি করতে পারেন কিনা, আগামী কয়েক সপ্তাহই তা নির্ধারণ করবে।