বেলেম / প্যারিস / নয়াদিল্লি — ২১ মার্চ ২০২৫ (আপডেট ১৯:০০ ইটি) — আমাজন রেইনফরেস্টের প্রবেশদ্বার বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন COP30-তে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ দিনের তীব্র আলোচনার পর উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি জলবায়ু কূটনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক অঙ্গীকার।
“আজকের দিনটি জলবায়ু ন্যায়বিচারের জয়,” বলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট (COP30-এর সভাপতি)। “দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো বলেছিল যে শুধু প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয় — এখন অর্থের ব্যাপারটি নিষ্পত্তি হয়েছে।” জাতিসংঘ মহাসচিব একে “মানবতার জন্য একটি চুক্তি” হিসেবে অভিহিত করেন।
১ ট্রিলিয়ন ডলার: কীভাবে ব্যয় হবে?
নতুন জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা (NCQG) অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর ১ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি অনুদান হিসেবে এবং বাকি অর্ধেক স্বল্প সুদের ঋণ ও বিনিয়োগ গ্যারান্টি হিসেবে দেওয়া হবে। অর্থায়নের মূল খাতগুলো হলো: (ক) নবায়নযোগ্য শক্তি স্থাপন ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণ, (খ) জলবায়ু অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতা প্রকল্প (বিশেষত উপকূলীয় ও কৃষিপ্রধান দেশগুলোর জন্য), (গ) ক্ষতি ও ধ্বংস তহবিল (যা ইতিমধ্যে জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য), (ঘ) সবুজ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো — প্রথমবারের মতো চীন ও ভারত এই অর্থায়নে অবদান রাখতে সম্মত হয়েছে, যদিও তারা ঐতিহ্যগতভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দাবি করে আসছিল। চীন বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার এবং ভারত ১০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপান মিলে বাকি অর্থের বড় অংশ বহন করবে।
আলোচনার মূল মুহূর্ত ও বাঁধা অতিক্রম
বিগত COP29-তে অর্থায়ন নিয়ে তীব্র অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো ওয়াকআউটের হুমকি দিয়েছিল। এই COP30-তে উত্তেজনা আরও চরমে পৌঁছেছিল — আলোচনা প্রায় ভেস্তে যাচ্ছিল যখন আফ্রিকা ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট (AOSIS) একত্রে চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দেয়। চীন ও ব্রাজিলের মধ্যস্থতায় শেষ রাতে একটি সমঝোতা সূত্র বেরিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি এক বিবৃতিতে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমান্ত মানে না — আমাদের সবাইকে অবদান রাখতে হবে।” তবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এই অর্থায়ন অনুমোদনের বিষয়ে সংশয় থাকলেও প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষা করবে।
বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য অর্থ কী?
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই চুক্তি একটি গেম-চেঞ্জার। বর্তমানে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে পিছিয়ে আছে। এই অর্থায়নের ফলে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে, ১০০ মিলিয়ন ছোট চাষি জলবায়ু-সহনশীল কৃষি কৌশল গ্রহণ করতে পারবে, এবং উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হবে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতিনিধি এই চুক্তিকে “আশার আলো” বলে অভিহিত করেছেন। “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুতির হুমকিতে ছিলাম। এই অর্থ আমাদের অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেবে,” বলেন বাংলাদেশের পরিবেশ উপদেষ্টা।
মালদ্বীপ ও কিরিবাতির মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে অভিযোজন প্রকল্পে অর্থায়ন এখন নিশ্চিত হলো।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও স্বচ্ছতা
যদিও প্রতিশ্রুতি ঐতিহাসিক, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, উন্নত দেশগুলোর নিজস্ব বাজেট ঘাটতি ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ জোগানো কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি — যাতে অর্থ দুর্নীতি বা অপব্যবহার না হয়। এই লক্ষ্যে COP30-তে একটি স্বাধীন জলবায়ু অর্থ মনিটরিং বোর্ড গঠনে সম্মত হয়েছে, যেখানে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশের প্রতিনিধি থাকবেন।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত খাতকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া ১ ট্রিলিয়ন ডলার তোলা সম্ভব নয়। তাই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে।
পরবর্তী COP31 সম্মেলন (২০২৬, তুরস্কে) এই অর্থায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রকৃত অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়া শুরু না হলে এই চুক্তি পুনরায় সংকটে পড়তে পারে। তবে আপাতত বিশ্ব নেতারা স্বস্তি ও আশায় ভরপুর — কারণ বৈশ্বিক দক্ষিণের দীর্ঘদিনের কণ্ঠস্বর আজ বিশ্বমঞ্চে শোনা গেল, এবং তা অর্থের মাধ্যমে রূপ নিল।
এই প্রতিবেদন নিয়মিত হালনাগাদ হচ্ছে। অর্থায়নের বিস্তারিত বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন কাঠামো আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হবে।
সম্পূর্ণ জলবায়ু অর্থায়ন বিশ্লেষণ পড়ুন →*ডেমো লিংক: বিস্তারিত প্রতিবেদন সাবস্ক্রিপশনে উপলব্ধ
